আবদুল কাদির আজাদ সুবহানী ছিলেন বিখ্যাত রব্বানী দর্শনের
প্রবক্তা। সাধারণ্যে তিনি আল্লামা আজাদ সুবহানী হিসেবে বেশি পরিচিত ছিলেন।
রব্বানী দর্শনের ভাবধারা এক সময় ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে
বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কিছুটা হলেও প্রভাব বিস্তার
করেছিল। বাঙালি মুসলিম রাজনীতিবিদ ও মওলানা ভাসানী, আবুল হাশিম, শামসুল হক ও
সাংস্কৃতিক সংগঠন তমুদ্দুন মজলিসের কর্মীরা এসব চিন্তাভাবনা দ্বারা
উজ্জীবিত হয়েছিলেন। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে মরহুম আবুল হাশিমের নেতৃত্বে
যে খেলাফতে রব্বানী পার্টি গড়ে উঠেছিল তা ছিল রব্বানী দর্শনের চিন্তাভাবনা
দ্বারা প্রাণিত। রব্বানী আন্দোলনের প্রভাব এখন স্তিমিত হয়ে এলেও আমাদের
দেশের চিন্তা ও বুদ্ধিজীবিতার জগতে এটা যথেষ্ট আলোড়ন তুলেছিল। স্বকালেই তাই
আজাদ সুবহানীর চিন্তাভাবনার মৌলিকত্ব ও বিশ্লেষণধর্মিতা ভাবুক জনের গভীর
ভাবনার বিষয়ও হয়ে উঠেছিল।
আজাদ সুবহানী ছিলেন মশহুর আলেম ও রাজনীতিবিদ। উপমহাদেশের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি আজাদি আন্দোলনে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং ব্রিটিশবিরোধী ও প্যান ইসলামবাদী ভাবনাচিন্তায় উজ্জীবিত হয়েছিলেন। তারপরেও তিনি ছিলেন মুখ্যত দার্শনিক ও অংশত রাজনীতিক। তিনি তার দার্শনিকতাকে রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রমের ভিতর দিয়ে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছিলেন। শুধু তাত্ত্বিকতার মধ্যে তার কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল না। সে হিসেবে তিনি ছিলেন এক অর্থে একজন প্রয়োগবাদী দার্শনিক।
আজাদ সুবহানী ১৮৯৬ সালে বর্তমান ভারতের যুক্ত প্রদেশের বালিয়া জেলার সিকান্দারপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সৈয়দ মুরতজা আলী ছিলেন একজন আলেম। পারিবারিকভাবে তারা ছিলেন সৈয়দ। বাবার কাছেই আজাদ সুব্বানীর লেখাপড়ার হাতেখড়ি। তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা হয় ঐতিহ্যবাহী জৌনপুর মাদরাসায়। এখানে তিনি হাদীস শাস্ত্রে বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন এবং মওলানা ফজলুর রহমান মুরাদাবাদীর কাছ থেকে হাদীসের সনদ লাভ করেন। ছাত্রাবস্থায়ই তিনি আরবি, ফারসি ও উর্দুতে যথেষ্ট পারদর্শিতা অর্জন করেন। বিশেষ করে একাডেমিক লেখাপড়ার পাশাপাশি জীবনের বিচিত্র দিক নিয়ে তার আগ্রহ ছিল প্রচুর। ইসলাম সম্পর্কে তার ব্যাপক পড়াশোনার কারণে তিনি এই বিষয়ে গভীর পান্ডিত্য অর্জন করেন। এ কারণে তার ভক্ত ও অনুরাগীরা তাকে আল্লামা উপাধি দেয়। ইংরেজি ভাষায়ও তার যথেষ্ট পারদর্শিতা ছিল। লেখাপড়া শেষে তিনি মাদরাসা শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং কানপুরের বিখ্যাত মাদরাসা ইলাহিয়াতে কাজ শুরু করেন। এই মাদরাসায় শিক্ষকতাকালীন তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। এর পূর্বে ছাত্রজীবনে কখনো তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেননি। এ ব্যাপারে তার রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু হন লাখনৌর বিখ্যাত আলেম মওলানা আবদুল বারী, যিনি খেলাফত আন্দোলনের সময় আলেমদের ঐক্যবদ্ধ করে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। বিখ্যাত খেলাফত নেতা মওলানা মোহাম্মদ আলীও ছিলেন মওলানা আবদুল বারীর অনুরাগী।
আজাদ সুবহানী রাজনীতিবিদ হিসেবে বিখ্যাত হয়ে যান কানপুর মসজিদকে কেন্দ্র করে। ১৯১৩ সালে স্থানীয় মুসলমানদের বিরোধিতা সত্ত্বেও কানপুর পৌরসভা একটি রাস্তা সোজা করার জন্য ওই শহরের একটি মসজিদের অংশ বিশেষ ভেঙে ফেলে। এতে মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয় এবং ভাঙা অংশ পুনঃনির্মাণের জন্য একত্রিত হলে পুলিশ ও সেনাবাহিনী গুলী চালায়। ফলে মুসলমানরা প্রচুর পরিমাণে হতাহত হয়। এই প্রতিবাদ আন্দোলনের প্রধান নেতা ছিলেন মওলানা আজাদ সুবহানী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ সরকার মওলানা সুবহানীকে অন্যান্য প্রতিবাদকামী মুসলমানদের সাথে গ্রেফতার করে এবং তিনি কয়েক মাস কারাগারে কাটান। কানপুর মসজিদের ঘটনা পরবর্তীতে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও ঝড় তুলেছিল।
কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর তিনি আঞ্জুমানে খুদ্দামে কাবা নামক সংগঠনে যোগ দেন এবং ১৯১৪ সালব্যাপী যুক্তপ্রদেশ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে আঞ্জুমানের লক্ষ্য ও কর্মসূচি নিয়ে বক্তৃতা করেন। আঞ্জুমানের উদ্দেশ্য ছিল তুর্কী খেলাফতের বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তার জন্য ভারতীয় জনমত গড়ে তোলা ও হজ্ব যাত্রা নির্বিঘ্ন করা। এর সাথে যুক্ত ছিলেন বিখ্যাত আলী ভ্রাতৃদ্বয়, মওলানা আবদুল বারী, হাকিম আজমল খান ও মোখতার আহমদ আনসারীর মতো নেতারা।
১৯১৮ সালে মওলানা সুবহানী দিল্লিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ সম্মেলনে যোগ দেন এবং এই সময় থেকে অন্যান্য আলেমদের সাথে যুক্ত হয়ে তিনি ইসলামের স্বার্থের ব্যাপারে মুসলিম লীগের সাথে সহযোগিতা করেন। মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনগুলোতে তিনি এর পর থেকে নিয়মিত যোগ দেন। ১৯৩৮ সালে কলকাতা মোহাম্মদ আলী পার্কে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের প্রথম দিনের অধিবেশনে তিনি সভাপতিত্ব করেছিলেন। ফ্রান্সিস রবিনসন লিখেছেন, ১৯১৯ সালে তুর্কি খেলাফতকে রক্ষা করার জন্য ভারতে খেলাফত কমিটি গঠিত হলে মওলানা সুবহানী তার অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। খেলাফত আন্দোলনের সময় ভারতবর্ষের প্রধান আলেমরা ঐক্যবদ্ধভাবে ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে একটি ফতোয়া প্রচার করেছিলেন যার মর্ম ছিল এরকম : ব্রিটিশের সহযোগিতা করা হারাম। ব্রিটিশ পরিচালিত স্কুল, কলেজ বর্জন করা ফরজ। কোর্টের চাকরি ও ওকালতি করা অবৈধ। পুলিশ ও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীভুক্ত থাকা ইসলামবিরোধী। ব্রিটিশ প্রদত্ত উপাধি গ্রহণ করা কাফিরের কাজ। যারা অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেবে না তারা যেন জিহাদের ময়দান থেকে পলায়িত। এই আন্দোলনে জান-মাল বিসর্জন করা ইসলামেরই পরিচায়ক।
এই বিখ্যাত ফতোয়ার অন্যতম স্বাক্ষর দাতা ছিলেন মওলানা সুবহানী। এই ফতোয়ার ফলে সাধারণ মুসলমানরা বুঝতে পেরেছিল ব্রিটিশবিরোধী খেলাফত আন্দোলনকে সহযোগিতা করা তাদের ধর্মীয় কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। ফলে আন্দোলনের তীব্রতা চতুর্দিকে ছড়িয়ে যায়। কোনো সন্দেহ নেই খেলাফত আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে টলিয়ে দিয়েছিল এবং এই আন্দোলনে আলেমরা নিয়েছিলেন এক বিপ্লবী ভূমিকা। ব্রিটিশকে চাপ দিয়ে তুর্কি খেলাফতকে রক্ষা এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য হলেও এর মধ্য দিয়ে ভারতের মানুষ সেদিন নিজেদের স্বাধীনতার স্পন্দন শুনেছিল।
১৯২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বোম্বেতে নিখিল ভারত খেলাফত কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় এবং সুবহানী এর উলামা অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন। একই বছর সেপ্টেম্বরে কলকাতায় অনুষ্ঠিত খেলাফত কনফারেন্সে তিনি সভাপতিত্ব করেন। তিনি যুক্ত প্রদেশের প্রাদেশিক খেলাফত কমিটির সভাপতি ছিলেন এবং এই দায়িত্বে থাকাকালে যুক্তপ্রদেশে খেলাফতের বাণী তিনি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ১৯১৯ সালে খেলাফত আন্দোলনের উত্তাপের মধ্যেই ভারতীয় আলেমরা তাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ গড়ে তোলেন। মওলানা সুবহানী ছিলেন এই সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। জমিয়তের বিভিন্ন কনফারেন্সেও তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। একই বছর দিনি উর্দুভাষার উন্নতিকল্পে কানুপুরে হালাকা-ই-আদাবিয়া স্থাপন করেন।
ব্রিটিশবিরোধী খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময় প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার বাইরে শরিয়ত আদালত স্থাপনের পক্ষে আমির-ই-শরিয়ত ধারণার উদ্ভাবন করেন বিখ্যাত মওলানা আবুল কামাল আজাদ এবং তাকে সহযোগিতা করেন মওলানা আজাদ সুবহানী। উল্লেখ্য, খেলাফত আন্দোলনের সময় মওলানা আজাদ শরিয়তপন্থী ছিলেন এবং ধর্ম ও রাজনীতির সমন্বয়কে অপ্রীতির চোখে দেখেননি। পরবর্তীকালে তার ভাবান্তর হয়েছিল। এই কারণে তিনি সুবহানীকে নিয়ে ইসলামী আদালত স্থাপনের উদ্যোগ নেন এবং তার বাস্তবায়ন শুরু হয় বিহার থেকে। ১৯২১ এর ২৫, ২৬ জুনে অনুষ্ঠিত প্রদেশিক জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের অধিবেশনে বিহারের আমির নির্বাচিত হয়। এই অধিবেশনে দেয়া বক্তৃতায় আজাদ ও সুবহানী ভারতবর্ষের মুসলমানদের ধর্মীয় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের আওতায় সংগঠিত করার একটি প্রকল্প পেশ করেন। যদিও এই প্রচেষ্টা বেশি দূর অগ্রসর হয়নি। রাজনীতি ইসলামের গন্ডির বাইরে নয়, এটি ইসলামী ব্যবস্থারই অংশ এবং দেশের রাজনীতিতে আলেমদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকা উচিত বলে মওলানা সুবহানী মনে করতেন। খেলাফত কনফারেন্স, মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামার প্লাটফরমে তিনি সবসময় বলার চেষ্টা করতেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতবর্ষের দুঃখের কারণ। এই উপনিবেশিক শাসনের কারণেই ইসলাম ভারতবর্ষে মসীবতের মধ্যে নিমজ্জিত হয়েছে। ইসলামকে রক্ষা করতে হলে তাই এই সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে হবে। এর একমাত্র উপায় হচ্ছে মুসলমানরা ভারতের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে সহযোগিতা করে আজাদির জন্য লড়াই করবে ও প্রয়োজনে অস্ত্র ধারণ করবে। এটা ইসলামী বিধিবিধান সঙ্গতও বটে। কোরআন ও হাদীস থেকে প্রামাণ্য যুক্তি হাজির করে তিনি চারণের মতো ঘুরে ঘুরে ভারতবর্ষের মুসলমানদের আজাদির লড়াইয়ে সেদিন উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন।
খেলাফত আন্দোলন চলাকালে ১৯২১ সালে মালাবারে ১০ লাখ মোপালা মুসলমান সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং তাদের কর্তৃত্বাধীন এলাকাকে খেলাফত রাজ্য হিসেবে ঘোষণা দেয়। আলী মুদালিয়ার নামে এক ব্যক্তিকে মোপালারা খলিফা হিসেবে ঘোষণা করে। ব্রিটিশ সরকার এই বিদ্রোহ নিষ্ঠুরভাবে দমন করে এবং হাজার হাজার মোপালা মুসলমানকে হত্যা করে। মওলানা সুবহানী ব্রিটিশের এই জঘন্য কা-ের তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং মালাবার ও মোপালা বলে একটি পুস্তিকা লেখেন যেখানে তিনি ব্রিটিশের বর্বরতার চিত্র তুলে ধরেন। খেলাফত আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়লে মওলানা সুবহানী কানপুরে কিছুদিন শ্রমিক আন্দোলনের সাথেও যুক্ত হয়েছিলেন। এ সময় তার ভিতর কিছুটা সমাজতন্ত্রী ভাবধারার উন্মেষ ঘটেছিল বলে ফ্রান্সিস রবিনসন দাবি করেছেন।৭ দেশ বিভাগের পর তিনি সোভিয়েত রাশিয়া সফর করে এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসাও করেছিলেন। তিনি তার ব্যাখ্যাত রব্বানী দর্শনের ভিতর পুঁজিবাদ বিরোধিতার কথাও বলেছেন, যদিও তিনি তা কোরআনের মৌল বাণী থেকে পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন। এ সব দেখে অনেকে তাকে জীবদ্দশায় সমাজতন্ত্রী ভাবাপন্ন বলে কিছুটা অভিযোগও করেছেন। এ অভিযোগ হয়তো সর্বাংশে সত্য নয়। কারণ কোরআনে যে সমতাবাদী সমাজ ব্যবস্থার ইঙ্গিত রয়েছে তা প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যে একটু অন্যরকম মনে হতেই পারে। মওলানা সুবহানী সে কথা উচ্চারণ করে ঝড় তুলেছিলেন কোনো সন্দেহ নেই।
সমসাময়িককালে তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের দিকেও কিছুটা ঝুঁকেছিলেন। ১৯২৩ সালে তিনি যুক্তপ্রদেশ প্রাদেশিক কংগ্রেসের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন ও মওলানা আজাদের সাথে বিভিন্ন সভা-সমিতিতে মূল্যবান ভাষণ দেন। ফ্রান্সিস রবিনসন জানিয়েছেন, মওলানা সুবহানী এ সময় একটি উদারনীতিক চিন্তাভাবনা লালন করেন ও হিন্দু মুসলমানের মিলিত সংগ্রামের ব্যাপারে উৎসাহিত হন।৮
যদিও তার এ উদারপন্থা অলীক প্রমাণ হতে বেশিদিন লাগেনি। জিন্নাহ ও ইকবালের মতোই কংগ্রেসের হিন্দু ঘেঁষা রাজনীতির কারণে তার মন বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং তিনি ১৯৩৪ সালে কংগ্রেস পরিত্যাগ করেন। ১৯৩৬ সালে তিনি মিসর সফর করেন এবং সেখানকার বিখ্যাত আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের সামনে ভারতীয় মুসলমানদের ধর্মাচরণ সম্পর্কে প্রাঞ্জল আরবিতে বক্তৃতা দেন। এখানে তিনি প্রায় তিন মাস অবস্থান করেন এবং মিসরের সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি সম্পর্কে ধারণা পান। এখান থেকে ইউরোপের কয়েকটি দেশ ঘুরে তিনি আমেরিকা পৌঁছেন এবং সেখানে কিছুদিন ইসলামের দাওয়াত দেন। নিউইয়র্কের মুসলিম সোসাইটিতে তিনি ইংরেজিতে এক গভীর পান্ডিত্যমূলক বক্তৃতাও দেন।
আমেরিকা থেকে তিনি সৌদী আরবে আসেন এবং এখানে ইবনে সউদের মেহমান হিসেবে তিন মাস অবস্থান করে সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারে সাহায্য করেন। অতঃপর পবিত্র হজ পালন করে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যকলাপে পুনরায় আত্মনিয়োগ করেন। তার এই আমেরিকা ও ইউরোপ সফরের দীর্ঘ কাহিনী তিনি বিবৃত করেছেন সফরনামা-ই-ইউরোপ ওয়া আমেরিকা নামক বইয়ে। দেশে ফিরে তিনি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পুনর্গঠনের চেষ্টা শুরু করেন। এটি যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন থেকেই তিনি এর সাথে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু এর কতিপয় সদস্য তখনকার ভারতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের অখ- ভারততত্ত্বের ধারণার সাথে ঐকমত্য পোষণ করে এবং এদের নেতৃত্ব দেন মওলানা হোসেন আহমেদ মাদানী।
মওলানা সুবাহানী এদের সাথে একমত হননি। কারণ তিনি মনে করেছিলেন কংগ্রেসের সেক্যুলার রাজনীতিকে সহযোগিতা করে আলেম সমাজ ইসলাম ও ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থকে রক্ষা করতে পারবে না। তাই তিনি মওলানা শাব্বির আহমদ উসমানীর নেতৃত্বে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ থেকে পৃথক হয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম গঠন করেন। তখনকার ভারতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জমিয়তে ইসলাম মুসলিম জাতীয়তাবাদকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে এবং মুসলিম লীগের রাজনৈতিক দাবির সমর্থনে প্রচার-প্রপাগা-া চালায়।
মওলানা সুবহানী নিজে সিলেট, ময়মনসিংহ, বর্ধমান ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চল সফর করে পাকিস্তানের দাবির যৌক্তিকতাকে ঔজস্বিতার সাথে তুলে ধরেন। এ সময় তিনি ভারতের মুসলমানদের কাছে বিশেষ শ্রদ্ধাভাজন হয়ে ওঠেন। কলকাতার গড়ের মাঠে বহুদিন ধরে ঈদের নামাজে ইমামতি করতেন মওলানা আবুল কালাম আজাদ। পাকিস্তান আন্দোলনের সময় কলকাতার মুসলমানরা ঈদের নামাজে ইমামতি করার জন্য মওলানা আজাদের স্থলে মওলানা সুবহানীকে মনোনীত করে।
১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের পর মওলানা সুবহানী পাকিস্তানে না এসে ভারতেই থেকে যান এবং স্বীয় মতবাদ ও চিন্তাধারা গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করার জন্য বিশেষ মনোযোগী হন। এ সময় তিনি রব্বানী ভাবধারা লিপিবদ্ধ করা ছাড়াও জামায়াত-ই-রব্বানী নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন। এর সদর দফতর ছিল বিহারের গোরখপুরে। সুবহানী নিজেই ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি। এর সদস্যরা পরস্পরের সাথে মোলাকাতকালে বলতেন, আমরা আল্লাহর খলিফা। সুবহানী তার জীবদ্দশায় রব্বানী ভাবধারাকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য জামিয়া রব্বানীয়া নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। যার প্রথম রেক্টর ছিলেন তিনি নিজেই। তিনি তার আজীবনের অর্জিত ধনসম্পত্তি এই প্রতিষ্ঠানটির পেছনে ব্যয় করেন। মওলানা আজাদ সুবহানী ১৯৬৩ সালে বিহারের গোরখপুরে ইন্তেকাল করেন।
আলেম হিসেবে সুবহানী ছিলেন অসাধারণ ও অনন্য। এত বড় পন্ডিত হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন সরল, অনাড়ম্বর ও বিনয়ী। তার চরিত্র মাধুর্যে সবাই যুগপৎ আলোকিত ও আশ্চর্য হতেন। তিনি নিজের নামের পাশে লিখতেন ফকির, গুনাহগার।
ফাহমিদ-উর-রহমান
http://www.dailyinqilab.com/archive_details.php?id=112166&&%20page_id=%2079&issue_date=%202013-06-04
আজাদ সুবহানী ছিলেন মশহুর আলেম ও রাজনীতিবিদ। উপমহাদেশের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি আজাদি আন্দোলনে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং ব্রিটিশবিরোধী ও প্যান ইসলামবাদী ভাবনাচিন্তায় উজ্জীবিত হয়েছিলেন। তারপরেও তিনি ছিলেন মুখ্যত দার্শনিক ও অংশত রাজনীতিক। তিনি তার দার্শনিকতাকে রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রমের ভিতর দিয়ে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছিলেন। শুধু তাত্ত্বিকতার মধ্যে তার কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল না। সে হিসেবে তিনি ছিলেন এক অর্থে একজন প্রয়োগবাদী দার্শনিক।
আজাদ সুবহানী ১৮৯৬ সালে বর্তমান ভারতের যুক্ত প্রদেশের বালিয়া জেলার সিকান্দারপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সৈয়দ মুরতজা আলী ছিলেন একজন আলেম। পারিবারিকভাবে তারা ছিলেন সৈয়দ। বাবার কাছেই আজাদ সুব্বানীর লেখাপড়ার হাতেখড়ি। তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা হয় ঐতিহ্যবাহী জৌনপুর মাদরাসায়। এখানে তিনি হাদীস শাস্ত্রে বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন এবং মওলানা ফজলুর রহমান মুরাদাবাদীর কাছ থেকে হাদীসের সনদ লাভ করেন। ছাত্রাবস্থায়ই তিনি আরবি, ফারসি ও উর্দুতে যথেষ্ট পারদর্শিতা অর্জন করেন। বিশেষ করে একাডেমিক লেখাপড়ার পাশাপাশি জীবনের বিচিত্র দিক নিয়ে তার আগ্রহ ছিল প্রচুর। ইসলাম সম্পর্কে তার ব্যাপক পড়াশোনার কারণে তিনি এই বিষয়ে গভীর পান্ডিত্য অর্জন করেন। এ কারণে তার ভক্ত ও অনুরাগীরা তাকে আল্লামা উপাধি দেয়। ইংরেজি ভাষায়ও তার যথেষ্ট পারদর্শিতা ছিল। লেখাপড়া শেষে তিনি মাদরাসা শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং কানপুরের বিখ্যাত মাদরাসা ইলাহিয়াতে কাজ শুরু করেন। এই মাদরাসায় শিক্ষকতাকালীন তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। এর পূর্বে ছাত্রজীবনে কখনো তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেননি। এ ব্যাপারে তার রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু হন লাখনৌর বিখ্যাত আলেম মওলানা আবদুল বারী, যিনি খেলাফত আন্দোলনের সময় আলেমদের ঐক্যবদ্ধ করে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। বিখ্যাত খেলাফত নেতা মওলানা মোহাম্মদ আলীও ছিলেন মওলানা আবদুল বারীর অনুরাগী।
আজাদ সুবহানী রাজনীতিবিদ হিসেবে বিখ্যাত হয়ে যান কানপুর মসজিদকে কেন্দ্র করে। ১৯১৩ সালে স্থানীয় মুসলমানদের বিরোধিতা সত্ত্বেও কানপুর পৌরসভা একটি রাস্তা সোজা করার জন্য ওই শহরের একটি মসজিদের অংশ বিশেষ ভেঙে ফেলে। এতে মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয় এবং ভাঙা অংশ পুনঃনির্মাণের জন্য একত্রিত হলে পুলিশ ও সেনাবাহিনী গুলী চালায়। ফলে মুসলমানরা প্রচুর পরিমাণে হতাহত হয়। এই প্রতিবাদ আন্দোলনের প্রধান নেতা ছিলেন মওলানা আজাদ সুবহানী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ সরকার মওলানা সুবহানীকে অন্যান্য প্রতিবাদকামী মুসলমানদের সাথে গ্রেফতার করে এবং তিনি কয়েক মাস কারাগারে কাটান। কানপুর মসজিদের ঘটনা পরবর্তীতে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও ঝড় তুলেছিল।
কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর তিনি আঞ্জুমানে খুদ্দামে কাবা নামক সংগঠনে যোগ দেন এবং ১৯১৪ সালব্যাপী যুক্তপ্রদেশ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে আঞ্জুমানের লক্ষ্য ও কর্মসূচি নিয়ে বক্তৃতা করেন। আঞ্জুমানের উদ্দেশ্য ছিল তুর্কী খেলাফতের বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তার জন্য ভারতীয় জনমত গড়ে তোলা ও হজ্ব যাত্রা নির্বিঘ্ন করা। এর সাথে যুক্ত ছিলেন বিখ্যাত আলী ভ্রাতৃদ্বয়, মওলানা আবদুল বারী, হাকিম আজমল খান ও মোখতার আহমদ আনসারীর মতো নেতারা।
১৯১৮ সালে মওলানা সুবহানী দিল্লিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ সম্মেলনে যোগ দেন এবং এই সময় থেকে অন্যান্য আলেমদের সাথে যুক্ত হয়ে তিনি ইসলামের স্বার্থের ব্যাপারে মুসলিম লীগের সাথে সহযোগিতা করেন। মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনগুলোতে তিনি এর পর থেকে নিয়মিত যোগ দেন। ১৯৩৮ সালে কলকাতা মোহাম্মদ আলী পার্কে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের প্রথম দিনের অধিবেশনে তিনি সভাপতিত্ব করেছিলেন। ফ্রান্সিস রবিনসন লিখেছেন, ১৯১৯ সালে তুর্কি খেলাফতকে রক্ষা করার জন্য ভারতে খেলাফত কমিটি গঠিত হলে মওলানা সুবহানী তার অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। খেলাফত আন্দোলনের সময় ভারতবর্ষের প্রধান আলেমরা ঐক্যবদ্ধভাবে ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে একটি ফতোয়া প্রচার করেছিলেন যার মর্ম ছিল এরকম : ব্রিটিশের সহযোগিতা করা হারাম। ব্রিটিশ পরিচালিত স্কুল, কলেজ বর্জন করা ফরজ। কোর্টের চাকরি ও ওকালতি করা অবৈধ। পুলিশ ও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীভুক্ত থাকা ইসলামবিরোধী। ব্রিটিশ প্রদত্ত উপাধি গ্রহণ করা কাফিরের কাজ। যারা অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেবে না তারা যেন জিহাদের ময়দান থেকে পলায়িত। এই আন্দোলনে জান-মাল বিসর্জন করা ইসলামেরই পরিচায়ক।
এই বিখ্যাত ফতোয়ার অন্যতম স্বাক্ষর দাতা ছিলেন মওলানা সুবহানী। এই ফতোয়ার ফলে সাধারণ মুসলমানরা বুঝতে পেরেছিল ব্রিটিশবিরোধী খেলাফত আন্দোলনকে সহযোগিতা করা তাদের ধর্মীয় কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। ফলে আন্দোলনের তীব্রতা চতুর্দিকে ছড়িয়ে যায়। কোনো সন্দেহ নেই খেলাফত আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে টলিয়ে দিয়েছিল এবং এই আন্দোলনে আলেমরা নিয়েছিলেন এক বিপ্লবী ভূমিকা। ব্রিটিশকে চাপ দিয়ে তুর্কি খেলাফতকে রক্ষা এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য হলেও এর মধ্য দিয়ে ভারতের মানুষ সেদিন নিজেদের স্বাধীনতার স্পন্দন শুনেছিল।
১৯২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বোম্বেতে নিখিল ভারত খেলাফত কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় এবং সুবহানী এর উলামা অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন। একই বছর সেপ্টেম্বরে কলকাতায় অনুষ্ঠিত খেলাফত কনফারেন্সে তিনি সভাপতিত্ব করেন। তিনি যুক্ত প্রদেশের প্রাদেশিক খেলাফত কমিটির সভাপতি ছিলেন এবং এই দায়িত্বে থাকাকালে যুক্তপ্রদেশে খেলাফতের বাণী তিনি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ১৯১৯ সালে খেলাফত আন্দোলনের উত্তাপের মধ্যেই ভারতীয় আলেমরা তাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ গড়ে তোলেন। মওলানা সুবহানী ছিলেন এই সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। জমিয়তের বিভিন্ন কনফারেন্সেও তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। একই বছর দিনি উর্দুভাষার উন্নতিকল্পে কানুপুরে হালাকা-ই-আদাবিয়া স্থাপন করেন।
ব্রিটিশবিরোধী খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময় প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার বাইরে শরিয়ত আদালত স্থাপনের পক্ষে আমির-ই-শরিয়ত ধারণার উদ্ভাবন করেন বিখ্যাত মওলানা আবুল কামাল আজাদ এবং তাকে সহযোগিতা করেন মওলানা আজাদ সুবহানী। উল্লেখ্য, খেলাফত আন্দোলনের সময় মওলানা আজাদ শরিয়তপন্থী ছিলেন এবং ধর্ম ও রাজনীতির সমন্বয়কে অপ্রীতির চোখে দেখেননি। পরবর্তীকালে তার ভাবান্তর হয়েছিল। এই কারণে তিনি সুবহানীকে নিয়ে ইসলামী আদালত স্থাপনের উদ্যোগ নেন এবং তার বাস্তবায়ন শুরু হয় বিহার থেকে। ১৯২১ এর ২৫, ২৬ জুনে অনুষ্ঠিত প্রদেশিক জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের অধিবেশনে বিহারের আমির নির্বাচিত হয়। এই অধিবেশনে দেয়া বক্তৃতায় আজাদ ও সুবহানী ভারতবর্ষের মুসলমানদের ধর্মীয় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের আওতায় সংগঠিত করার একটি প্রকল্প পেশ করেন। যদিও এই প্রচেষ্টা বেশি দূর অগ্রসর হয়নি। রাজনীতি ইসলামের গন্ডির বাইরে নয়, এটি ইসলামী ব্যবস্থারই অংশ এবং দেশের রাজনীতিতে আলেমদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকা উচিত বলে মওলানা সুবহানী মনে করতেন। খেলাফত কনফারেন্স, মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামার প্লাটফরমে তিনি সবসময় বলার চেষ্টা করতেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতবর্ষের দুঃখের কারণ। এই উপনিবেশিক শাসনের কারণেই ইসলাম ভারতবর্ষে মসীবতের মধ্যে নিমজ্জিত হয়েছে। ইসলামকে রক্ষা করতে হলে তাই এই সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে হবে। এর একমাত্র উপায় হচ্ছে মুসলমানরা ভারতের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে সহযোগিতা করে আজাদির জন্য লড়াই করবে ও প্রয়োজনে অস্ত্র ধারণ করবে। এটা ইসলামী বিধিবিধান সঙ্গতও বটে। কোরআন ও হাদীস থেকে প্রামাণ্য যুক্তি হাজির করে তিনি চারণের মতো ঘুরে ঘুরে ভারতবর্ষের মুসলমানদের আজাদির লড়াইয়ে সেদিন উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন।
খেলাফত আন্দোলন চলাকালে ১৯২১ সালে মালাবারে ১০ লাখ মোপালা মুসলমান সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং তাদের কর্তৃত্বাধীন এলাকাকে খেলাফত রাজ্য হিসেবে ঘোষণা দেয়। আলী মুদালিয়ার নামে এক ব্যক্তিকে মোপালারা খলিফা হিসেবে ঘোষণা করে। ব্রিটিশ সরকার এই বিদ্রোহ নিষ্ঠুরভাবে দমন করে এবং হাজার হাজার মোপালা মুসলমানকে হত্যা করে। মওলানা সুবহানী ব্রিটিশের এই জঘন্য কা-ের তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং মালাবার ও মোপালা বলে একটি পুস্তিকা লেখেন যেখানে তিনি ব্রিটিশের বর্বরতার চিত্র তুলে ধরেন। খেলাফত আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়লে মওলানা সুবহানী কানপুরে কিছুদিন শ্রমিক আন্দোলনের সাথেও যুক্ত হয়েছিলেন। এ সময় তার ভিতর কিছুটা সমাজতন্ত্রী ভাবধারার উন্মেষ ঘটেছিল বলে ফ্রান্সিস রবিনসন দাবি করেছেন।৭ দেশ বিভাগের পর তিনি সোভিয়েত রাশিয়া সফর করে এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসাও করেছিলেন। তিনি তার ব্যাখ্যাত রব্বানী দর্শনের ভিতর পুঁজিবাদ বিরোধিতার কথাও বলেছেন, যদিও তিনি তা কোরআনের মৌল বাণী থেকে পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন। এ সব দেখে অনেকে তাকে জীবদ্দশায় সমাজতন্ত্রী ভাবাপন্ন বলে কিছুটা অভিযোগও করেছেন। এ অভিযোগ হয়তো সর্বাংশে সত্য নয়। কারণ কোরআনে যে সমতাবাদী সমাজ ব্যবস্থার ইঙ্গিত রয়েছে তা প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যে একটু অন্যরকম মনে হতেই পারে। মওলানা সুবহানী সে কথা উচ্চারণ করে ঝড় তুলেছিলেন কোনো সন্দেহ নেই।
সমসাময়িককালে তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের দিকেও কিছুটা ঝুঁকেছিলেন। ১৯২৩ সালে তিনি যুক্তপ্রদেশ প্রাদেশিক কংগ্রেসের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন ও মওলানা আজাদের সাথে বিভিন্ন সভা-সমিতিতে মূল্যবান ভাষণ দেন। ফ্রান্সিস রবিনসন জানিয়েছেন, মওলানা সুবহানী এ সময় একটি উদারনীতিক চিন্তাভাবনা লালন করেন ও হিন্দু মুসলমানের মিলিত সংগ্রামের ব্যাপারে উৎসাহিত হন।৮
যদিও তার এ উদারপন্থা অলীক প্রমাণ হতে বেশিদিন লাগেনি। জিন্নাহ ও ইকবালের মতোই কংগ্রেসের হিন্দু ঘেঁষা রাজনীতির কারণে তার মন বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং তিনি ১৯৩৪ সালে কংগ্রেস পরিত্যাগ করেন। ১৯৩৬ সালে তিনি মিসর সফর করেন এবং সেখানকার বিখ্যাত আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের সামনে ভারতীয় মুসলমানদের ধর্মাচরণ সম্পর্কে প্রাঞ্জল আরবিতে বক্তৃতা দেন। এখানে তিনি প্রায় তিন মাস অবস্থান করেন এবং মিসরের সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি সম্পর্কে ধারণা পান। এখান থেকে ইউরোপের কয়েকটি দেশ ঘুরে তিনি আমেরিকা পৌঁছেন এবং সেখানে কিছুদিন ইসলামের দাওয়াত দেন। নিউইয়র্কের মুসলিম সোসাইটিতে তিনি ইংরেজিতে এক গভীর পান্ডিত্যমূলক বক্তৃতাও দেন।
আমেরিকা থেকে তিনি সৌদী আরবে আসেন এবং এখানে ইবনে সউদের মেহমান হিসেবে তিন মাস অবস্থান করে সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারে সাহায্য করেন। অতঃপর পবিত্র হজ পালন করে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যকলাপে পুনরায় আত্মনিয়োগ করেন। তার এই আমেরিকা ও ইউরোপ সফরের দীর্ঘ কাহিনী তিনি বিবৃত করেছেন সফরনামা-ই-ইউরোপ ওয়া আমেরিকা নামক বইয়ে। দেশে ফিরে তিনি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পুনর্গঠনের চেষ্টা শুরু করেন। এটি যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন থেকেই তিনি এর সাথে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু এর কতিপয় সদস্য তখনকার ভারতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের অখ- ভারততত্ত্বের ধারণার সাথে ঐকমত্য পোষণ করে এবং এদের নেতৃত্ব দেন মওলানা হোসেন আহমেদ মাদানী।
মওলানা সুবাহানী এদের সাথে একমত হননি। কারণ তিনি মনে করেছিলেন কংগ্রেসের সেক্যুলার রাজনীতিকে সহযোগিতা করে আলেম সমাজ ইসলাম ও ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থকে রক্ষা করতে পারবে না। তাই তিনি মওলানা শাব্বির আহমদ উসমানীর নেতৃত্বে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ থেকে পৃথক হয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম গঠন করেন। তখনকার ভারতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জমিয়তে ইসলাম মুসলিম জাতীয়তাবাদকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে এবং মুসলিম লীগের রাজনৈতিক দাবির সমর্থনে প্রচার-প্রপাগা-া চালায়।
মওলানা সুবহানী নিজে সিলেট, ময়মনসিংহ, বর্ধমান ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চল সফর করে পাকিস্তানের দাবির যৌক্তিকতাকে ঔজস্বিতার সাথে তুলে ধরেন। এ সময় তিনি ভারতের মুসলমানদের কাছে বিশেষ শ্রদ্ধাভাজন হয়ে ওঠেন। কলকাতার গড়ের মাঠে বহুদিন ধরে ঈদের নামাজে ইমামতি করতেন মওলানা আবুল কালাম আজাদ। পাকিস্তান আন্দোলনের সময় কলকাতার মুসলমানরা ঈদের নামাজে ইমামতি করার জন্য মওলানা আজাদের স্থলে মওলানা সুবহানীকে মনোনীত করে।
১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের পর মওলানা সুবহানী পাকিস্তানে না এসে ভারতেই থেকে যান এবং স্বীয় মতবাদ ও চিন্তাধারা গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করার জন্য বিশেষ মনোযোগী হন। এ সময় তিনি রব্বানী ভাবধারা লিপিবদ্ধ করা ছাড়াও জামায়াত-ই-রব্বানী নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন। এর সদর দফতর ছিল বিহারের গোরখপুরে। সুবহানী নিজেই ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি। এর সদস্যরা পরস্পরের সাথে মোলাকাতকালে বলতেন, আমরা আল্লাহর খলিফা। সুবহানী তার জীবদ্দশায় রব্বানী ভাবধারাকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য জামিয়া রব্বানীয়া নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। যার প্রথম রেক্টর ছিলেন তিনি নিজেই। তিনি তার আজীবনের অর্জিত ধনসম্পত্তি এই প্রতিষ্ঠানটির পেছনে ব্যয় করেন। মওলানা আজাদ সুবহানী ১৯৬৩ সালে বিহারের গোরখপুরে ইন্তেকাল করেন।
আলেম হিসেবে সুবহানী ছিলেন অসাধারণ ও অনন্য। এত বড় পন্ডিত হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন সরল, অনাড়ম্বর ও বিনয়ী। তার চরিত্র মাধুর্যে সবাই যুগপৎ আলোকিত ও আশ্চর্য হতেন। তিনি নিজের নামের পাশে লিখতেন ফকির, গুনাহগার।
ফাহমিদ-উর-রহমান
http://www.dailyinqilab.com/archive_details.php?id=112166&&%20page_id=%2079&issue_date=%202013-06-04
No comments:
Post a Comment